আলোচ্য গল্প আমাদের সবার প্রিয় পি.কে. মামাকে নিয়ে। এই ঘটনাগুলো পি.কে. মামা ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালীন। এতক্ষণে পি.কে মানেটা বলা হলো না। পি.কে. মানে হচ্ছে প্রেম কিশোর। মামার নাম ছিল কামাল হোসেন। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর নিজেই নিক নিয়েছে পি.কে। গরম কী শীত সদা তার গাঁয়ে থাকতো ভেন্টিলেশন থাকা ফুটো গেঞ্জি, গেঞ্জির পকেটে চকচকে বিশ টাকার নোট, কান্ধে তারছাড়া একটা একোয়াষ্টিক গীটার। তার কাছে হলরুমে হাল আমলের সব বাদ্যই ছিল। গভীর রাত অবধি গলা সাধতো সে। সকাল বেলা উঠে ঘন্টাব্যাপী মুখ হা করে আআআ শব্দ করতো। আশেপাশের রুমবাসীরা তার সুমধুর আ ধ্বনি শুনেই লুঙ্গি চিপে বাথরুম মুখে ভো দৌঁড় দিত।
তবে একটা গান দিয়ে মামা বাজিমাত করেছিল। গানের কথায় পরে আসি, মূলত: নবীনবরণ অনুষ্ঠানে তার গলার খ্যাতি ছড়ানো আর ফার্ষ্ট ইয়ারের মেয়েদের মনোযোগ আকর্ষনই মূল কারণ। এ বিষয়ে সে সফল বলা যায়। প্রতিবছর নবীনবরণের সময়, মামার ক্রিয়াকৌশল দেখার জন্য বন্ধু এবং সিনিয়র, জুনিয়র মহল অতি আগ্রহান্বিতভাবে ষ্টেজে তুলে দিত। কোনরকমে ষ্টেজে উঠেই মামা শুরু করতো "পরে না চোখের পলক, কি তোমার রুপের ঝলক"। পরে না চোখের পলক অংশে ডান হাত উঁচু করে ডান দিকের সব ললনার দিকে আর "কি তোমার রুপের ঝলক" অংশ দিয়ে বাম হাত উঁচু করে বাম দিকের সব ললনার দিকে লম্বা এক ঝলক নজর বুলাতো। কিছুক্ষণ পর দেখা যায় ফাষ্ট ইয়ারের ছেলে মেয়েরা ও বাকী সকলে এবং সত্যি সত্যি, সবাইকে অবাক করে দিয়ে পি.কে. মামা ফাষ্ট ইয়ারের মেয়েদের নজর কেড়ে নিতো। মেয়েরা অবাক বিস্ময়ে আমাদের এই মেধাবী মামার দিকে তাকিয়ে থাকতো। পরিশেষে, ড্রামস, বেজ গীটার, কী-বোর্ড বাদক পিছন ফিরে যন্ত্রপাতি বাজাতো আর অন্যদিকে মামার বুকে বাজতো গীটারের হৃদম।
তো পি.কে মামা একবার এক ফার্ষ্ট ইয়ারের সুন্দরী অপরূপার প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া শুরু করলো। বলা যায়, পুরো ইউনির ফার্স্ট ইয়ারের মেয়েদের গার্ডিয়ান ছিল সে। পি.কে. মামায় গার্ডিয়ান গিরি করতে করতে সেই সুন্দরী ললনার প্রেমে পতিত হয়। অনেক চেয়ে চিন্তে তার মোবাইল নাম্বার জোগাড় করলো। বেশ কয়েক দিন চুটিয়ে কথা বলার পর দেখা সাক্ষাতের দিনক্ষণ ঠিক হলো। মামা অনেক খোঁজাখুজি করে বঙ্গবাজার থেকে নিয়ে আসলো বিশেষ এক টি-শার্ট। টি-শার্ট পরে হাতে ফুটন্ত লাল গোলাপের আঁটি আর কান্ধে তারছাড়া একোয়াষ্টিক গীটার ঝুলিয়ে রওয়ানা দিল টিএসসি'তে। অপরুপা তার এক নিকট বান্ধবী সমেত আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণটির। কিছুক্ষণ পর আমাদের মামা গোটা বত্রিশ দন্ত বিকশিত করে সম্মুখে উপস্থিত হলো। অপরূপা বান্ধবী সহ খিলখিলিয়ে হাসা শুরু করলো। তাই দেখে মামা বুকে যখন ছুরির আঘাত লাগবে লাগবে ভাব, ঠিক তখনই অপরূপা পার্স থেকে দশ টাকা বের করে মামার হাতে ধরিয়ে দিল। মামা সাগ্রহে জিজ্ঞেস করলেন এটা দিয়ে কি হবে? অপরূপার জবাব, "পি.কে. ভাই এটা দিয়ে আপনার টি-শার্টের বামপাশের ফুটোটা সেলাই করে নিয়েন"। এই বলে হনহন করে বান্ধবী সমেত হলের দিকে হাঁটা শুরু করলো।
মামার সাথে কাথা বালিশ আর তোষক ভর্তি ছারপোকাও বসবাস করতো। তারা মামার রক্ত নিয়মিত পান করতো আর উৎফুল্ল চিত্তে বংশ বৃদ্ধি করে চলতো। মামা যেন তার গানবাজনা সাধনার দর্শক হিসেবে তাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। তার রুমে কেউ বেরাতে গেলে ছারপোকার অযাচিত নিমন্ত্রণ গ্রহণ না করে পারতো না। মামার গান বাজনার ভক্ত জুটে গিয়েছিল অনেক। কিন্তু ছারপোকার ভয়ে কেউই তার রুমমুখী হওয়ার সাহস পেত না। শুধু রাস্তাঘাট আর ডিপার্টমেন্টেই ছেলেদের আবদার মেটাত। মামা রুম থেকে বের হওয়া মানে চিপাচাপায় গোটা দশেক ছারপোকা নিয়েই বের হওয়া। রাস্তাঘাটে কিংবা ক্লাসে মামাকে বেশীর ভাগ সময় শরীরের অলিগলি চুলকাতে ব্যস্ত দেখা যেত।
মামা আগের যাত্রায় ব্যর্থ হওয়ার পর হাল ছেড়ে দেয়নি। বরং অনেকটা জেদী হয়ে গেল। আরও কয়েকজন ফার্ষ্ট ইয়ারের প্রেমে মশগুল হয়ে আর আকাশের তারা গুনেগুনে থার্ড ইয়ারে পরপর দুইবার ডাব্বা মারলো। সর্বশেষ এক পানপাতা মুখাবয়বের রূপবতীর প্রেমে উদ্বেলিত হয়ে উঠলো। যথারীতি ফোনালাপের মাধ্যমে সাক্ষাত স্থান টিএসসিতে গিয়ে উপস্থিত হলো। রূপবতীর সাথে রেওয়াজ মোতাবেক এক বান্ধবী ছিল। এবার মামা ফুটো টি-শার্ট বাদ দিয়ে লাল পানপাতাওয়ালা টি-শার্ট গাঁয়ে চড়িয়েছে আর কলার ছাড়া ফুলপ্যান্ট ছিল পরনে, সাথে সেই গীটারটি। প্যান্টের কলার উঁকি দিয়ে পশ্চাদদেশের ক্লিভেজ স্পষ্টত দৃশ্যমান হচ্ছিল। হাতের লালগোলাপের তোরা ধরিয়ে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো মামা। পানপাতা সুন্দরী মামার হাসি দেখে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। কারণ মামা হাসি দিলে হাসি না হয়ে অদ্ভূত একটা শব্দ হয়। ঠিক যেন বর্ষাকালে কোলাব্যাঙের ডাক। তো হাসতে হাসতে মামার সম্মুখের উর্ধ্বপাটির বাঁধানো নকল দাঁতটা খুলে পড়ে গেল। মামা মাটিতে কোন অদৃশ্য বস্তু খুঁজে পাওয়ার ভান করে অতিদ্রুত দাঁতটা উঠিয়ে জায়গামত সেট করে দিল।
কিন্তু একি মামার শরীর আজকে এত বেশী চুলকায় কেন? বিশেষ করে পশ্চাদদেশে একটু বেশীই চুলকাচ্ছে। মামার মনে পড়লো পরিহিত কাপড় চোপড়ের ভাজ ঠিক রাখার জন্য কালকে থেকে বেডের তলায় ছিল। এই সুযোগে ছারপোকা সম্প্রদায় পঙ্গপালের ন্যায় ঢুকে পড়েছে। মাত্রাতিরিক্ত চুলকানো দেখে পানপাতা সুন্দরী বিশ টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললো, "যান চুলকানির চিকিৎসা করে আসেন আগে"। অগত্যা মামা বিরস বদনে আর ক্লান্ত বিধ্বস্ত মনে রুমে ফিরে আসলো।
মামা সেদিন রাতেই বিশ টাকা দিয়ে ছাড়পোকা নিধন ঔষধ কিনে নিয়ে আসলো। বিছানাপাতি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে শুয়ে পায়ের উপর পা রেখে অন্য কোন তন্বীর কথা চিন্তা করা শুরু করলো। আর গানবাজনা ছেড়ে দিয়ে কবিতা লেখায় মনোনিবেশ করলো। কবিতা লেখায় যোগ্যতার মানদন্ড স্বরূপ নিচে তার একটি কবিতা তুলে ধরা হলো:
আকাশে উড়ে একটি কাক
ভাত খেয়েছিলাম দুপুরে
মাছ দিয়ে ঢেকে শাক।
পড়েছিলাম সেদিন স্ত্রী করা শার্ট
দেখা হবে বলে
দাড়ি গোঁফে ছিল ফ্রেন্স কাট।
টিএসসিতে হলো প্রথম সাক্ষাত
উপস্থিত হলাম নিয়ে শাদা মাথা, শার্ট
বুড়োভাম ভেবে গালে পড়লো সপাত
কাকের বিষ্ঠায় হইলাম কুপোকাত।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন